সৈয়দা নাফিসা তারান্নুম

বেশ কিছুদিন ধরে কিছু দেশি-বিদেশি ‘মীম’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ঘুরপাক খাচ্ছে। সারমর্ম হলো—মায়েরা অনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ দিচ্ছেন, আর করুণমুখী সন্তানেরা দিশেহারা। মা কী চাইছেন, তা বুঝতে তো পারছেই না, আবার সঠিক জিনিসটা দিতে না পারলে বকুনি খেতে হবে, সেই ভয়েও অস্থির। আমি এমন একটি মীম দেখে সঙ্গে সঙ্গে আমার বোন মেহতাজকে পাঠালাম—“আরে দেখ! এই সমস্যা তো দেখছি সার্বজনীন!”

পৃথিবীর অপর প্রান্তে বসবাসরত আমার একমাত্র বোন মেহতাজের প্রতিক্রিয়া এলো একটি দাঁত বের করা হাসির ইমোজি। সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হলো কান্নারত আরেকটি ইমোজি। কোনো বাক্য আদান-প্রদান না হলেও ইমোজি দুটির মর্ম আমি পরিষ্কার বুঝে গেলাম। ব্যাপারটা হাসি-ঠাট্টার ছলে তুলে ধরা হয়েছে বটে, তবে বাস্তবের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিগুলোতে মায়ের তীক্ষ্ণ ধমকগুলো যে তীরের মতো এসে বিঁধত, সেই ক্ষতগুলো এখনও কাঁচা রয়ে গেছে।

এই তো আট-দশ বছর আগের কথা হবে। আমি তখন অবিবাহিত, বাবার ঘরের অতি আদরের রাজকুমারী। ইউনিভার্সিটির ক্লাস না থাকলে সূর্য যতক্ষণ না সরাসরি মাথার ওপর এসে পড়ত, তার আগে বিছানা ছেড়ে ওঠার কোনো যুক্তি যেন আমার বিধানেই ছিল না। তো, কোনো এক ছুটির দিনে মধ্যাহ্নের আগমনের তাগিদে বিছানার উষ্ণতাকে ক্ষণিকের বিদায় জানালাম। সকালের নাশতা খাব, নাকি দুপুরের খাবার সেরে ফেলব—সেই হিসাব কষতে কষতে রুম থেকে বের হলাম। বেরোতেই খেয়াল হলো, বাসায় রাতে মেহমান আসার কথা। একজন-দুজন নয়, ত্রিশজন! তার মানে, আমার মা এখন আর শুধু আমার মা নন। যিনি রান্নাঘরে তারস্বরে নির্দেশ ছুড়ে চলেছেন, তিনি একই সঙ্গে ইভেন্ট ম্যানেজার, শেফ এবং আমাদের বাসার সব গৃহকর্মীর আতঙ্কের কারণ। কোন বেলার খাবার চাইতে যাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ হবে, সেই ভাবনার উপসংহারে পৌঁছানোর আগেই শুনলাম, মা চেঁচিয়ে বলছেন, “উঠেছেন মহারানি? এইবার গোসলটা শেষ করে অন্তত নিজের ঘরটা গুছিয়ে ফেলেন!”

“আর মা… ওই নাশতা…?” আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সেইটা তো আছেই! সবে তো বাজে বারোটা! সেই সকাল আটটা থেকেই টেবিলে নাশতা সাজিয়ে রাখা আছে। খেয়ে আমাকে ধন্য কর!”

বাবা রে বাবা! যতটা ভয়াবহ আঁচ করছিলাম, মায়ের মেজাজ তার চেয়ে বহুগুণ খারাপ—তা বুঝতে বাকি রইল না। সামনে না পড়তে পারাটাই শ্রেয়, তবে সেইটা সম্ভব হবে না কিছুতেই। সাহায্য করতে পারি বা না পারি, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে আমি যে অতিশয় আগ্রহী, সেটা মাকে দেখাতেই হবে। লাভ বিশেষ কিছু হবে না, তবে দিন শেষে বকুনির মাত্রা হয়তো কিছুটা হালকা হবে। আমার বোনের পরীক্ষা থাকায় তাকে এই যাত্রাপালায় অংশগ্রহণ করতে হলো না। যদিও সে জানত, কোনো না কোনো ফাঁকে তার দিকেও মায়ের অভিযোগের গ্রেনেড ছুটে গিয়ে পড়বে, তাই বুদ্ধি করে যতক্ষণ সম্ভব গা ঢাকা দিয়েই রইল।

হঠাৎ খেয়াল হলো, বাবা কোথায়? তাঁর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না কেন? এই ঘর, ওই ঘর উঁকি মারতেই দেখলাম, বেচারা বারান্দায় বসে সর্বশক্তি দিয়ে কিছু একটা ঘষাঘষি করতে ব্যস্ত।

“কী পরিষ্কার করছ, বাবা?”

“আরে দেখ না! এই রুপার বাটিগুলো সেই কোন সালে নেপাল থেকে এনেছিলাম। তোর মা এত শখ করল, মেহমানদের জন্য এগুলোতে একটু মিষ্টি পরিবেশন করবে। কিন্তু কেমন কালো হয়ে আছে। টুথপেস্ট দিয়ে ঘষা দিচ্ছি, বুঝলি! দেখিস, কী চিকচিক করবে!”

আমি মুচকি হেসে সরে এলাম। হয় আমার বাবা একটু বুদ্ধি খাটিয়ে এই কাজ বেছে নিয়েছেন, যাতে মায়ের চক্ষুশূল হতে না হয়, নয়তো মা-ই তাঁকে এই কাজে জড়িয়ে দিয়েছেন, কারণ সেই একই। যাই হোক, কোনোমতে নাশতা মুখে পুরে গোসলের উদ্দেশ্যে যাচ্ছি, তখন মায়ের ডাক পড়ল, “এইদিকে আয় তো একটু!”

দ্বিতীয় ডাক পড়ার আগেই এগিয়ে গিয়ে বললাম, “বলো মা, কী লাগবে?”

“স্টোররুমে যা তো! ওপরের তাক থেকে ‘ইয়ে’র কৌটাটা এনে দে, মাংসে দেব।”

এত পরিষ্কার, সোজাসাপ্টা একটি আদেশ! কী সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে গুদামঘরে ঢুকতেই ওপরের তাকে একটি নিঃসঙ্গ কৌটা পাওয়া যাবে, যেটার মধ্যে ‘ইয়ে’ রাখা আছে। কী রাখা আছে, তা জানা নিষ্প্রয়োজন, কারণ কৌটো নিশ্চয়ই একটাই সেখানে। ঢুকেই প্রথম ঝলকে যা দেখলাম, তা হলো—কৌটা রাখা আছে আটটি!

“মা! কোন কৌটা?” আরও স্পষ্ট বিবরণের আশায় প্রশ্নটা করে বসলাম।

“কয়বার বলতে হয় তোকে! লাল ঢাকনা দেওয়া যেটায় ‘ইয়ে’ রাখা আছে।”

লাল ঢাকনা দেওয়া মোট কৌটা পেলাম চারটি। এবার? চারটিই কি নিয়ে যাব? নাকি আবার জিজ্ঞেস করব? কোনটা কম বিপজ্জনক হবে? একটু নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “মা, বড়গুলোর একটা? না ছোট?”

জবাবে পেলাম ভয়ংকর নীরবতা। তারপর জোরেশোরে পা ফেলে মায়ের হেঁটে আসার শব্দ। বড় এক ঢোক গিলে করুণ মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝড়ের গতিতে ঢুকে মা হ্যাঁচকা টানে নামিয়ে নিলেন সেই ‘ইয়ে’র কৌটা। তারপর আমার দিকে কটমট করে চেয়ে বললেন, “একটা ছোট কাজ বললাম, তাতেও যদি একটু সাহায্য পাই! ওই আমাকেই চুলা বন্ধ করে ঘুরে এসে নিতে হলো। যা, তুই সেজেগুজে ঘরে ঢুকে বসে থাক। কিছু করতে হবে না তোর!”

অতি ছোট এই বিষয় নিয়ে মায়ের এত কড়া ঝাড়ি, আর তার সঙ্গে তাঁকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হওয়ার লজ্জা—দুইয়ে মিলে চোখ ঘোলাটে করে দিল। মনে পড়ে, গাল ফুলিয়ে ঘরে গিয়ে বসে ছিলাম, বাবা এসে ডাক না দেওয়া পর্যন্ত।

আজ এত কাল পরও এই কৌতুকাবহ মীম দেখে পুরোনো এমন কত ঘটনা মনে করে একাই কিছুক্ষণ হাসলাম। মায়েদের বোধ হয় এটা এক প্রথাগত স্বভাব, নইলে পৃথিবীর এত মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের মিল কীভাবে বের হলো?

মোবাইলফোনটি বিশ্রামে রেখে ঢুকলাম রান্নাঘরে। খালা মাছটা সুন্দর করে ধুয়ে রেখেছে। কষিয়ে একটু পানি দিয়ে নেড়ে নিলাম। অফিসের কিছু জরুরি ইমেল আছে, সেগুলো একটু দেখে নিতে পারি এই ফাঁকে—এই ভেবে রান্নাঘর থেকে বের হতে হতে বললাম, “খালা, দু-এক মিনিট পর মাছটাতে একটু ‘ইয়ে’ দিয়ে চুলার জ্বাল নিভিয়ে দিয়ো!”

পেছন থেকে অতি বিভ্রান্ত এক মহিলার প্রশ্ন এল, “আম্মা, কী দিমু?”

“উফ! ‘ইয়ে’ যে রাখা আছে, ওই বাটিতে—ওইটা ওপর থেকে ছিটিয়ে দিয়ো!”

“আম্মা! কী কইলেন? কুনটা ছিটামু?”

“ধুর খালা, সব তোমাকে এইভাবে ভেঙে বলতে হয় কেন? লাগবে না, যাও! আমিই করছি!”

নিজেই কুচি করে রাখা ধনেপাতা মাছের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে চুলার জ্বাল নিভিয়ে বেরিয়ে এলাম। এত সহজভাবে বলা কথাও কীভাবে বোঝে না মানুষ, অবাক লাগে!

রুমে ঢুকতেই ফোন বেজে উঠল। নিশ্চয়ই মা।

“হুম মা, বলো।”

“কিরে, রান্না করিস? নাকি ছুটির দিন, তাই বের হচ্ছিস কোথাও?”

“না মা, রান্না শেষ। অফিসের কিছু টুকটাক কাজ আছে, সারব এখন।”

“আচ্ছা, কর তাহলে। তোর বাবার ‘ইয়ে’টা একটু পাঠিয়ে দিস।”

“বাবার কী?”

“উফ! ‘ইয়ে’টা নিলি না সেই দিন? তোর কাজ হয়ে গেলে দিয়ে দিস। তোর বাবা আজ বলছিল, তার লাগবে।”

দীর্ঘশ্বাসটা চেপে গেলাম। “ঠিক আছে মা, পাঠিয়ে দেব।”

ফোন রেখে বাবাকে একটি মেসেজ পাঠালাম, “তোমার কোনো জরুরি জিনিস কি আমার কাছে আছে, যা তোমার এখনই ফেরত লাগবে?”

বাবার উত্তর, “ওজন মাপার যন্ত্রটা। কাজ ফুরালে পাঠিয়ে দিস।”

চেপে রাখা দীর্ঘশ্বাসটি সুযোগ বুঝে এবার বেরিয়ে পড়ল। যাই, ‘ইয়ে’টা একটা ব্যাগে ভরে রাখি। বিকেলে পাঠিয়ে দেব। মায়ের কাছ থেকে আর কোনো রকম তাগিদ আসার আগেই।

বয়স হয়তো বেড়েছে ভালোই, চুলেও পাক ধরল বলে, তাই বলে মায়ের ঝাড়ি হজম করার মতো শক্তি এখনও আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়নি। কেন যে মানুষটা একটু সহজভাবে বুঝিয়ে বলতে পারে না! ঠিকঠাকভাবে বললে তো তাঁর জীবনটাও সহজ হয়, সঙ্গে আমাদেরটাও। কে যে বোঝাবে তাঁকে!

আমি বাবা কখনোই এমন হব না। এইসব আজগুবি প্রথা আমি ভাঙবই, ভাঙব!