অ-মানুষ
'এইখানে রাতে আসতে কোনো মানুষ সাহস করে না, যারা ভুলেও এসে পরসে, তারা আমার পেটে. তুমি কে?
…….
পাশের হোটেলের থেইকা একটা মাছ আর কোনোরকম দুইমুঠ ভাত চুরি কইরা, গ্রাম থেইকা একটু দূরে এই নির্জন জাগায় আইসি শান্তি কইরা খাইতে. ইজাগায় নাকি কারো বাপেও সাহস করে না যাইতে, বিশেষ কইরা রাইতে এক রক্ত খেকো নাকি ঘরে দুইটা লোকরে কইতে শুনলাম। কিন্তু ধরা না খাইতে আমি সাহস করলাম, একটা খাতের বেড়া টপকে ওই নির্জন গ্রামে ঢুকে পড়লাম। এখানে একটু পরপর নির্জন কতগুলা ভাঙা বাড়ি , তারই যেকোনো একটায় ঢুকে একোনায় বসে চুরি করা খাবার ঠোঙা থেকে খাইতেসিলাম এর মধ্যে একটা বিশাল কিছুটা চিকন একটা বেটার আকৃতি টের পাইলাম. একটা কর্কশগোলার বেটা-বেটি একলগে কথা কইলে যেমন স্বর হইতো অমন, রক্ত লাল চোখ দুইটা আমার দিকে অপলক চাইয়া.
'কেউ কয় টোকাই, কেউ কয় চোর তবে আমার কোনো নাম নাই. কিন্তু আমি মানুষ না দেইখা সাহস করতে পারসী.'
লোকমা করা ভাত না গিলে ওর দিকে তাকায় উত্তর দিলাম। ওই আকৃতিটা আমার দশহাত দূরে যেখানে দাঁড়ায় ছিল ঐখানে মাটিতে বইয়া পরে.
'জীর্ণশীর্ণ ছোট্ট বাচ্চা হইলেও তো তোমার চামড়া, মাংসল দেহ আর তাতে রক্ত আছে. তুমি কিভাবে মানুষ না!'
খাইতে আর পারলামনা, ঠোঙাটা পাশে রাইখা দিলাম, জীবনে কেউ আমার সাথে প্রথম কথা কইতে চাইলো তাই পেট খালি থাকলেও মনডা ভইরা গেলো.
'রক্ত মাংসে মানুষ হওয়া যায়না বাবা, সমাজে স্বীকৃতি লাগে মানুষ হইতে. আমার মা টোকাই ছিলেন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করসিলেন এক লোকের হারানো টাকারবাগ দিয়া. হেরে মানুষ মারতে মারতে মাইরা ফেলাইসে ভুল বুইঝা. আমি মানুষ হইতে মরবার চাইনা, আমার মা'র দেয়া নাম ভুইলা গেসি, নিজেরে অমানুষ নাম দিসি। নিজেরে অমানুষ দাবি করি.'
'আমি এককালে মানুষ ছিলাম, নাম ছিল হরি, ব্রিটিশ আমলে এক জমিয়াদেরর সবচেয়ে প্রিয় গোলাম। আমিও মানুষ হইতে চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম সম্মান আর ভালোবাসা।'
'তোমার এই অবস্থা কেমনে হইলো।'
'জমিদার বাড়িতে আমার খুব নাম ডাক ছিল, প্রত্যেকটা কাজে হরি হরি করে সবাই পাগল, গ্রামের সবাই আমাকে খুব পছন্দ করতো। কারো সাথে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না, আমি জীবনে একটা মাছি পর্যন্ত মারিনি গো। কিন্তু এই পৃথিবীতে হিংসা আর অহংকার মানুষ কে ছারে না। আমার সাথে কাজ করতো মহেশ, ওকে বন্ধু ভেবেছিলাম, কিন্তু ও ভাবতোনা। আমার বানানো রান্নায় বিষ ঢেলে আমার নাম অভিযোগ তুলে, আমাকে জমিদার বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় গ্রামের লোকের অত্যাচার, অবহেলায় দুইদিন চলে যায়। শেষে আমি পেটের দায়ে আবার জমিদারের বাড়ি গেলাম তিনি আমাকে মাফ করলেন না, জানা গেলো দুইদিন ধরে তার স্ত্রী বিষক্রিয়ার কারণে ভুগছেন আর যখন আমি পৌছালাম তখন তিনি মারা গেলেন। আমাকে গ্রামবাসীর সামনে মৃত্যুদণ্ডের জন্য আদেশ করা হলো, আমি পালিয়ে গেলাম। দুঃখে কষ্টে গ্রাম থেকে পালিয়ে জঙ্গলে গেলাম। সেখানে একটা বয়স্ক লোক ছিলেন, যেই ভগবান আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন তাকে আমি ছেড়ে দিলাম সেদিন তার কথায়। সে পেল তার যজ্ঞে আমার বলি আর আমি পেলাম শক্তি প্রতিশোধের। সবার আগে মহেশকে চিবিয়ে চিবিয়ে খেলাম, আমার মধ্যের মানুষ মরে জন্মনিলো একটা অমানুষ একটা রক্ত খেকো জানোয়ার। একেএকে গ্রামের সবাইকে খেতে শুরু করলাম, জমিদারককেও প্রতিশোধের আগুনে খেয়ে ফেললাম । সেই রাতেই গ্রামের এক পন্ডিত গ্রামের আসেপাশে একটা পবিত্র রেখা টেনে দিয়ে আমাকে আটকে দিলো যেটা টপিকে তুমি এসেছো, প্রায় ১০০ বছর হয়ে গেছে।'
আমি আর পারলামনা বসে থাকতে হরির কথা শুনে, উঠে গিয়ে ওর কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।
'আমার মা, এভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরতো যখন দুনিয়া আমারে কষ্ট দিতো। তোমার কোনো দোষ নাই হরি। তোমার সাথে যারা এমন করসে তারা অমানুষ ছিল, তুমি না।'
ওর শীতল দেহ,খোশখশে চামড়া, বিরাট বিরাট নখের হাত দিয়ে আমাকে জড়ায় ধরসে, ওরে বুঝাইতে বুঝাইতে আমি নিজেও কিছু বুঝলাম। আমি আমার খাবার নিয়ে যাইতে গেলাম, ও ঐখানেই বইয়া রইলো আর আমাকে ইশারায় এইখান থেকা খাওয়ান শেষ করে যাইতে কইলো, আমি তাই করলাম, আমার কেন যেনো মন বলসে আমাকে ও কিছু করবে না আর তাইই হইলো, আমি খাইলাম আর ততক্ষন চুপচাপ হরি আমারে দেখলো। একটা আওয়াজ করলো না। আমি উঠে হাটা শুরু করসি এমন সময় আমারে ডাক দিলো।
'অমানুষ।'
আমি ফিরে তাকাইলাম। আলোর মধ্যে হরি দাঁড়ায় ছিল, ধোবদবে সাদা চামড়া, সুন্দর দেখতে,একটা মোচ, লম্বা চুল, ঠোটটা লাল টকটকে, লাল চোখ দিয়ে পানি পড়ছে তবে মুখে হাসি।
'আবার আইসো। তোমাকে অমানুষ বলতে চাইনা, কারণ তোমার মতো, মানুষের মতো মানুষ আমি দেখি নাই। তোমার মতো সাহসী ছেলে আমি দেখি নাই, অভি মানে সাহসী, তোমাকে আমি অভি বলে ডাকতে পারি?'
আমি উপরে নিচে মাথা নাড়লাম মুখে হাসি নিয়ে আর সেখান থেকে চলে গেলাম, আমার একটা নাম আছে,কেউ আমাকে মানুষ মনে করে, আমি আর অমানুষ নই।


