ফিরে এসো।
প্রিয় প্রতিমা,
হঠাৎ খুব চিঠি লিখতে ইচ্ছে হলো। ভাবলাম, তোকে একটা চিঠি লিখি। তবুও জানিস, এবার কিন্তু আমি এই চিঠির উত্তর আশা করছি। গত কয়েকবার তুই আমাকে কোনো উত্তর দিসনি। এতে আমার মন খারাপ হয়েছে। আগে তো এমন করতিস না। কত কথা বলতিস আমাকে, আর এখন কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল, তোর সঙ্গে ঠিকমতো কথাই হয় না। তুই কি আমার ওপর রাগ করেছিস?
জানিস, আজকাল লোকেরা আমাকে পাগল বলে। আমি নাকি একা একা কথা বলি। মা খুব কষ্ট করে তাদের কথা শোনে। এটা কোনো কথা? আমি তো তোর সঙ্গেই কথা বলি। এতে পাগলামির কী আছে? তুই যে আমার সঙ্গে কথা বলিস, সেটা কি ওরা শুনতে পায় না?
বাদ দে। সেদিন আমি আমাদের পুরোনো স্কুলব্যাগটা হাতে নিলাম। কত দিন যে ওটা খোলা হয়নি! খুলে দেখি, তোর পছন্দের কলমটা। কলমটা যত্ন করে তুলে রেখেছি। তুই এলে ফেরত দেব। তুই আবার অন্যের জিনিস হারিয়ে গেলে আমার ওপর দোষ চাপিয়ে দিবি, আমি জানি। ছোটবেলা থেকেই তোর এই স্বভাবটা গেল না।
জানিস, আজ খুব পুকুরপাড়ে যেতে মন চাইছিল। আমার এখনও মনে আছে, শেষ যেদিন গিয়েছিলাম, তুই আমাকে ছেড়ে সাঁতার কাটতে নেমে পড়েছিলি। কতবার তোকে ডাক দিলাম, তুই শুনলি না! একবারও ফিরে তাকালি না। তোর ওপর সেদিন কী রাগটাই না হয়েছিল আমার! কিন্তু তুই তো জানিস, আমি বেশিক্ষণ তোর ওপর রাগ করে থাকতে পারি না।
যাক, পুরোনো কথা আর না বলি। তোর সঙ্গে সেই কবে কথা হয়েছে, তারপর থেকে কত সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। তুই আর একবারও আমার কাছে এলি না। এখন তোকে বলার জন্য কত কথা জমে আছে, অথচ তোকে কোথাও খুঁজে পাই না। আমার ওপর রাগ করলি? নাকি আমাকে ভুলেই গেলি? ফিরে আয় না, তোকে অনেক কথা বলার আছে।
জানিস, মা-ও আজকাল কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। কেউ তোর কথা তুললে মায়ের চোখ দুটো কেমন ভিজে ওঠে। মাঝে মাঝে দেখি, আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করলেও কিছুই বলে না। একদিন তোকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মা হঠাৎ থেমে গেল। আমার দিকে কেমন করে যেন তাকাল, তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। আমি কিছুই বুঝলাম না। তুই তো আছিস, তবু সবাই এমন করে কেন বলে, বল তো?
ফিরে আয়, বোন। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে হাত বাড়িয়ে তোকে খুঁজি। আগে তোকে ডাকলেই পেতাম। এখন ডাকলেও কেউ সাড়া দেয় না। ঘরটা কেমন অচেনা লাগে। বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে ওঠে, এক অচেনা অশান্তি ঘিরে ধরে আমাকে। কখনো কখনো মনে হয়, তুই হয়তো পাশের ঘরে আছিস, আমার ওপর রাগ করে চুপ করে বসে
আছিস। আমি তোকে ডাকতে গিয়েও থেমে যাই।কেন জানি না, ইদানীং তোর সঙ্গে কথা বলতে গেলেই সব কেমন গুলিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে মনে হয়, তুই ফিরে এলে সব ঠিক হয়ে যাবে। মা আবার হাসবে, আর বাড়িটা আবার কোলাহলে ভরে উঠবে। তুই আবার আমার সঙ্গে ঝগড়া করবি, আমার জিনিসপত্র নিয়ে পালাবি। আর আমার যত অভিমান জমে আছে, সব বলব। একটাও বাদ দেব না। তুই শুধু একবার ফিরে আয়, বোন।
জানিস, মাঝে মাঝে আয়নায় নিজের মুখ দেখলে কেমন অদ্ভুত লাগে। ছোটবেলা থেকে সবাই বলত, আমাদের দুজনকে নাকি আলাদা করে চেনাই যায় না। তুই হাসলে আমিও হাসতাম, তুই কাঁদলে আমারও কান্না পেত। আমরা নাকি একে অপরের প্রতিচ্ছবি। কথাটা মনে পড়লে আজকাল নিজেকে কেমন একা লাগে।
বল তো, তুই যদি আমার প্রতিচ্ছবি হোস, তবে তুই কোথায় হারিয়ে গেলি?
ফিরে আয়। আমি আর কোনো অভিযোগ করব না। তোর কলমটা ফেরত দেব, তোর সব কথা শুনব। শুধু একবার আমার পাশে এসে বস।
আর একবার ফিরে আয়।
ইতি, তোর প্রতিচ্ছবি।


